উইকএন্ডে ‘নবাবী মেজাজ’ চান? ট্রেনের টিকিট থেকে দুপুরের লাঞ্চের খোঁজ – দুদিনের জন্যে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ হাতের মুঠোয়!

উইকএন্ডে ‘নবাবী মেজাজ’ চান? ট্রেনের টিকিট থেকে দুপুরের লাঞ্চের খোঁজ – দুদিনের জন্যে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ হাতের মুঠোয়!

নাহ, সময় কোথায় অত? লম্বা ছুটি পাওয়াই তো আজকের দিনে সোনার হরিণ! কিন্তু মনটা তো বারো মাসই ‘ভবঘুরে’ হয়ে থাকতে চায়, তাই না? চিন্তা নেই! কলকাতা বা আশেপাশের জায়গা থেকে মাত্র দু’দিনের ছুটি পেলেই ঘুরে আসতে পারেন সুবে বাংলার (অবিভক্ত বাংলা-বিহার-ওড়িশা) নবাবদের প্রাচীন রাজধানী, ইতিহাস আর স্থাপত্যের শহর মুর্শিদাবাদ।
শীতের মরশুমে হোক বা বসন্তে— ভাগীরথীর তীরে এই শহর যেন আজও ইতিহাসের ভারী নিঃশ্বাস নিয়ে অপেক্ষা করে। আপনার জন্য সাজানো হলো এক ফুরফুরে দুই দিনের মুর্শিদাবাদ ভ্রমণসূচি। চলুন, এই ঐতিহাসিক জনপদে ইতিহাসের গন্ধ শুঁকে আসি!

গাড়িতে বা বাইকে গেলে আপনিই আপনার মর্জির মালিক; তবে সকাল সকাল পৌঁছে যাওয়াই ভালো, যাতে একটু rest নিয়ে শুরু করতে পারেন site seeing. কলকাতা থেকে বহরমপুর 180-200 km রাস্তা তাই গাড়িতে কল্যানী এক্সপ্রেসওয়ে আর NH 12 এ রানাঘাট, কৃষ্ণনগর, বেলডাঙ্গা হয়ে গেলে 5 ঘণ্টার কাছাকাছি সময় লাগতে পারে। ট্রেনে গেলে details রইলো নিচে।

কলকাতা থেকে যাত্রা (ট্রেন তথ্য) সেরা ট্রেন (Source: Where Is My Train):
হাওড়া/শিয়ালদহ থেকে: হাওড়া-আজিমগঞ্জ কবিগুরু এক্সপ্রেস (13017) বা ভাগীরথী এক্সপ্রেস (13103) অথবা হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস (13113) বেছে নিতে পারেন।
সকালের ট্রেন: হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস (13113) (কলকাতা স্টেশন, সকাল 6:50 মিনিট), মুর্শিদাবাদে পৌঁছায় প্রায় সকাল 10:20 মিনিট-এ।
টিকিট মূল্য (আনুমানিক): 2S (সেকেন্ড সিটিং) ₹95-₹100; CC (চেয়ার কার) ₹350; SL (স্লিপার) ₹120.
কোথায় নামবেন: মুর্শিদাবাদ (MBB) বা বহরমপুর কোর্ট (BPC) স্টেশনে নেমে টোটো বা অটো বুক করুন।

প্রথম দিন: নবাব দর্শনে ও হাজার দুয়ারীর মায়ায়
সকালের ট্রেনে বা গাড়িতে মুর্শিদাবাদ বা বহরমপুরে পৌঁছে হোটেল বা লজে চেক-ইন করার পর সময় নষ্ট নয়! আমাদের অভিজ্ঞতায় সেরা একটি হোটেলের খোঁজও রইলো নিচে। প্রথমেই চলুন মূল আকর্ষণ হাজারদুয়ারী প্যালেস (Hazarduari Palace) ও মিউজিয়াম। আসল নকল মিলিয়ে হাজার দরজাওয়ালা এই ব্রিটিশ স্থাপত্য এক বিশাল নবাবী মিউজিয়াম যেখানে রাখা আছে মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত হাতির দাঁতের কাজ থেকে শুরু করে মোহনলাল এর পলাশী যুদ্ধের কামান অবধি। আর ভেতরের মিউজিয়ামে বাংলার নবাবী ইতিহাস থমকে আছে।

যদি আপনি ইতিহাসের ভক্ত হন তাহলে সময় নিয়ে ঢুকবেন অবশ্যই। এরপর পাশেই থাকা বিশাল বড়ো ইমামবাড়া (Bara Imambara) দেখতেই পারেন যদি আপনার ভাগ্য সাথে থাকে, কারণ এটি দর্শকদের জন্য খোলা থাকে বছরে মাত্র 9 দিন (মূলত পবিত্র ঈদের সময়)। এছাড়া পাশেই রয়েছে মদিনা মসজিদ আর বাচ্চাওয়ালি তোপ (Bachhawali Tope) যা কিনা তৎকালীন বিখ্যাত কামান গুলির মধ্যে একটি। হাতে সময় থাকলে যেতে পারেন 4 কিলোমিটার দূরে ফুটি মসজিদ
বিকেলে অটো বা টোটো করে যেতে পারেন মতিঝিল (Moti Jheel)-এর দিকে। ভাগীরথীর একটি অংশকে বাঁকিয়ে নওয়াজিশ খান এর তৈরি অশ্বক্ষুরাকৃতি এই ঝিলে একসময় মুক্ত (মোতি) চাষ হতো। বর্তমানে এটি রয়েছে Bengal Tourism (Biswa Bangla) এর পরিচালনায়। এর শান্ত পরিবেশ আর তার ধারে দাঁড়িয়ে নবাবদের সেই সময়ের কথা ভাবতে মন্দ লাগবে না।

ও হ্যাঁ, হাজারদুয়ারীর কাছেই হোটেল ‘হাজারদুয়ারী ফ্যামিলি রেস্টুরেন্ট’ -এ বা বহরমপুরের বিখ্যাত ‘আদি ঢাকা হিন্দু হোটেল’ -এ বাঙালি খাবার ও নবাবী ঘরানার পদ চেখে দেখতে ভুলবেন না।

দ্বিতীয় দিন: পলাশীর প্রান্তর
আজ সকালে একটু তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন। আজকের দিনটা ঐতিহাসিক স্মৃতি আর স্থাপত্যের অনুসন্ধানে কাটবে।

প্রথমে চলে যান জৈন ব্যবসায়ী ধনপৎ সিং দুগারের তৈরি কাঠগোলা বাগান (Kathgola Palace)। এই প্রাসাদ ও সংলগ্ন জৈন মন্দির আজও তার আভিজাত্য ধরে রেখেছে। এখানে হয়েছে বেশ কিছু বাংলা সিনেমার শ্যুটিং, রয়েছে আপনাকে চমকে দেওয়ার মত কিছু শতাধিক পুরোনো কাঠের আসবাব, একটি ছোট কিন্তু অন্যরকম চিড়িয়াখানা, আর বিশাল এলাকা জুড়ে আমবাগান।

এরপর যেতেই হবে আপনাকে বিখ্যাত (কিম্বা কুখ্যাত) জগৎ শেঠের বাড়ি (Jagat Sheth Musium) যেখানে পাবেন মাটির নিচের সুড়ঙ্গের ভিতরে নবাবী আসবাব আর মুদ্রার সমাহারের সাথেই ইতিহাস-বিখ্যাত মসলিন শাড়ীর দেখা।
কাঠগোলা প্যালেস থেকে জগৎ শেঠের বাড়ির রাস্তায় পড়বে নসিপুর রাজবাড়ী, ঢুঁ মারতেই পারেন ফাঁসীমঞ্চ আর তৎকালীন দশাবতার মূর্তি কিম্বা সোনার জড়ির কাজ করা বেনারসী শাড়ি দেখতে।

রাজবাড়ী ছেড়ে একটু এগোলেই পাবেন জাফরগঞ্জ গোরস্থান (Jafarganj Cemetery) যেখানে রয়েছে মীরজাফর ও তার পরিবারের সমাধি, সব মিলিয়ে নাকি 1100 টি কবর রয়েছে এখানে।
এরপর চলে যান কাটরা মসজিদ (Katra Masjid) যেখানে কোনো এক সিঁড়ির ধাপে শুয়ে আছেন নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ – মুর্শিদাবাদ শহরের পত্তনকারী, যিনি ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে এখানে এনেছিলেন। হাজারদুয়ারীর মত এটিও Archaeological Survey of India দ্বারা পরিচালিত। নবাবী আমলের ইঁটের কাজ আর সংলগ্ন বাগানটিও দেখবার মত।

এরপর আশেপাশেই ঘুরে নিতে পারেন জাহান কোষা কামান (Destroyer of the World – Jahan Kosha Canon) সপ্তদশ শতকে হিন্দু কর্মকার জনার্দনের তৈরি অষ্টধাতুর 7 টন ওজনের এই কামানটি রয়েছে তোপখানা নামক এলাকায় যার দূরত্ব খাতরা মসজিদ থেকে মাত্র 500 মিটার। মুর্শিদাবাদের এই ট্যুরিস্ট স্পট টির অন্যতম বাহন কিন্তু ঘোড়ার গাড়ি, ঠিক এক্কার মত না হলেও যেগুলোকে আমরা ছ্যকরা গাড়ি বলি, তাই এখানে এসে toto র পাশাপাশি এটাও মিস করবেন না।

এরপর বিকেলে (কিম্বা self transport options থাকলে তৃতীয় দিন সকালে) চলে যান ভাগীরথী পেরিয়ে পশ্চিমে। মুর্শিদাবাদ এসে নবাব সিরাজ উদ দৌল্লার সমাধি যাবেন না – সেটা হয় না। সিরাজ, দাদু আলীবর্দী খাঁ আর মা বেগম লুৎফুন্নিসার কবর সমেত খোশবাগ এ গেলে আপনার মন চলে যাবেই সেই প্রাক-ব্রিটিশ বাংলা তথা ভারতের ইতিহাসে।

এবার দেখে নিন কোথায় থাকতে পারেন এই দুটি দিন। হাজারদুয়ারি এলাকায় অনেক options রয়েছে ভালো হোটেল বা লজের, আপনি চাইলে অনলাইন বুকিং করে অথবা স্পটে গিয়ে একটু খোঁজ করলেই ভালো জায়গা পেতে পারেন।

তবে যাতে আপনি হোটেল খোঁজার চিন্তা বাদ দিয়ে শুধু ঘোরাটুকু উপভোগ করতে পারেন তাই আমরা দেব আপনাকে সবচেয়ে ভালো stay options গুলির একটির সন্ধান। South Indian Food & Lodge, ঠিক হাজারদুয়ারি প্যালেসের ২৫০ মিটার দূরে, নতুন তৈরী হওয়া well maintained হোটেল গুলির মধ্যে একটি। ছিমছাম ঘর বিছানা ব্যালকনি সহ অমায়িক ব্যবহার – ঘুরতে গিয়ে এগুলোই তো আমরা সবার আগে চাই! (এই পোস্টটি কোনোভাবেই উক্ত হোটেল দ্বারা sponsored নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন হতেই পারে।)

ফিরে আসা যাক পরের স্পট এর কথায়। শান্ত সমাহিত খুশির বাগান Khosbag থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন কিরিটেশ্বরী কালী মন্দির যা একান্ন সতীপিঠের একটি। নদীর এই পাড়েই একটু দূরে রয়েছে অষ্টাদশ শতকে অযোধ্যা রাম রায়ের তৈরি কাশিমবাজার রাজবাড়ী যা এখনো দুর্গাপুজোর জন্যে বিখ্যাত।

পুরো মুর্শিদাবাদে নামকরা দর্শনীয় স্থান বলতে আর একটি জায়গাই বাকি আছে – পলাশীর (আম বাগান) যুদ্ধ প্রান্তর যা মুর্শিদাবাদ আর নদীয়ার বর্ডারে ও অবস্থিত। মূল রাস্তা থেকে একটু ভিতরে এখানে রয়েছে সিরাজের একটি আবক্ষ মূর্তি ও একটি সৌধ (Plassey War Monument), যা দেখলেই আপনার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে সেদিনের কথা ভেবে, 23 শে জুন 1757 সালে যেদিন ভারতের স্বাধীনতা সূর্য অস্ত্য গেছিল দেশদ্রোহিতার মেঘে।

যে পলাশীর সম্মন্ধে স্বয়ং এডমান্ড ব্রুক একদিন বলেছিলেন, “The long-term outcome of Plassey was to place a very heavy revenue burden upon Bengal.”

সন্ধ্যা নামার আগে ভাগীরথী নদীর শান্ত ঘাটে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে এই ছোট কিন্তু ঐতিহাসিক ভ্রমণের স্মৃতিগুলো মনের ডায়েরিতে ভরে নিন। নবাবী আমলের স্থাপত্য, ভাগীরথীর স্নিগ্ধতা আর ইতিহাসের ভারী নিঃশ্বাস— এই সবকিছুর মাঝে আপনার দু’দিনের মুর্শিদাবাদ ভ্রমণ যেন এক টাইম মেশিনের সফর! এই শীতে বা বসন্তে একবার ঘুরে আসুন, মনটা সতেজ হয়ে উঠবেই!

ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।

ভবঘুরের পক্ষ থেকে সবার জন্য শুভকামনা রইলো।

ধন্যবাদ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *