শীতের সকালে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানটার বেঞ্চ এ বসে খাবারের কাগজের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড়ে শব্দ করে একটা তৃপ্তির চুমুক দিতে দিতে অখিল বাবু নীলেশ বাবু কে বললেন “নাহ, দেশটা দেখছি গোল্লায় গেলো, কিচ্ছু আর রইলোনা। “
নীলেশ বাবু বললেন “তা যা বলেছেন! কালে কালে আর কি যে দেখতে হবে কে জানে!”
– “তবে যাই বলেন চা টা কিন্তু বেড়ে বানিয়েছে তপন।”
অখিলবাবু বললেন, “একদম ঠিক বলেছেন! হবে নাকি আর এক কাপ?”
– “ওরে তপন আর এক কাপ করে দিয়ে যা বাবা। মনে আছে তো আমার আবার সুগার! তাই আমার টা চিনি ছাড়া”…

কলকাতা সেক্টর ৫ এর একটা ব্যস্ত সন্ধ্যে। কয়েকটা ছোট-বড়ো চায়ের গুমটিতে গিজগিজ করছে কর্পোরেটকর্মীদের ভিড়। “তামাক সেবন ক্যান্সার এর কারণ” লেখা হোডিং এর ঠিক নিচে রাশি রাশি কাউন্টারে সিগারেট খাওয়া frustrated ছেলে মেয়ের ধূমপানের ধোঁয়ায় হোডিং এর লেখা প্রায় আবছা হয়ে এসেছে। সিগারেটের ধোঁয়ার সাথেই তাদের রোজনামচা, খারাপ লাগা – ভালো লাগা যেন ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে…
প্রথমজন: “ভাই মালটা হেব্বি জ্বালাচ্ছে, এরকম TL আমি জিন্দেগীতে দেখিনি ভাই, কিছুতেই সরস্বতী পুজোয় ছুটি দেবে না, এদিকে পুজোর দিন সবাই মিলে বন্ধুরা ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান আছে, এরকম করলে আমি ভাই কাজ ছেড়ে দেব।”
দ্বিতীয়জন: “আর বলিস না! আমাদের তো আর এক জ্বালা ! বলে নাকি টার্গেট মিট না হলে সরস্বতী পুজোর দিন ওভার টাইম করতে হবে। ভাল্লাগে বল?”
তৃতীয়জন: “ছাড় তো ভাই! যা হবে দেখা যাবে। বেশি করলে এসব না সেদিন। বলবো হেব্বি সারির খারাপ বলছি যেতে পারবো না”
– “বাদ দে ছাড়.. মাসি তিনটে চা দাও না… দুটো দুধ, একটা লিকার। “
– “চল ভাই ধরা একটা, তিনজন মিলে চা খেতে খেতে শেষ হয়ে যাবে। “

আসা যাওয়ার পথে এই ঘটনা গুলো আমাদের ভীষণ পরিচিত। ইংরেজরা আমাদের অনেক ক্ষতি করলেও একটা ভালো জিনিস দিয়ে গেছে সেটা হলো “চা” আর বাকি “চায়ে পে চর্চা” টা বাঙালির নিজস্ব সংযোজন।
ভালো চায়ের কদর করেন না এরকম মানুষ অনেক কম দেখা যায়। আবার অনেক মানুষ এরকম ও আছেন যারা চা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে ভীষণ ভালোবাসেন।
আজ আমরা সেরকম একটা এক্সপেরিমেন্ট করার মতো চায়ের খোঁজে চলে গেছিলাম “ফালতু চায়” তে। হ্যাঁ, একদমই ঠিক শুয়েছেন দোকানের নাম “ফালতু চায়”। চিংড়িঘাটা, কলকাতা ৭০০১০৫ (Near Bypass Dhaba, EM Bypass) অটো স্ট্যান্ডের ঠিক উল্টোদিকে যেখানে Vibekananda Statue আছে, তার পাশের রাস্তা দিয়ে জাস্ট ঢুকে বামদিকে গেলেই দোকানটি পাবেন। চলে আসতে পারেন বাসে, চিংড়িঘাটা বাসস্ট্যান্ডে নেমে মাত্র দু মিনিটের হাঁটা রাস্তা বা অটো করে এসে অটো স্ট্যান্ড এ নামতে পারেন। আপনি যদি ওই এলাকায় নতুন হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে “বিবেকানন্দ স্ট্যাচু এর সামনে যাবো” বললেই যে কেউ রাস্তা দেখিয়ে দেবে। দোকানটির বিশেষ পরিচিতি থাকায় দোকান খুঁজে না পেলে আপনি ওখানে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে দোকানটি।
চায়ের সাথে নোনতা কিছু থাকলে চা খাবার মজাটা দ্বিগুণ বেড়ে যায় বলেই হয়তো ঠিক তার উল্টোদিকে আছে একটি স্ন্যাক্স এর দোকান। যেখান থেকে আপনি চপ, সিঙ্গাড়া সহ পেয়ে যাবেন বিভিন্ন ধরনের মজাদার স্ন্যাক্স, অতিরিক্ত কম দামে।
এবার আসা যাক ফালতু কথায় থুড়ি “ফালতু চায়” এর কথায়। জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিলাম যে, দাদার দোকান ওনার বাবা ইচ্ছে করেই দোকানের নামকরণ এরকম করেছিলেন যাতে নামটি বিশেষ আকর্ষণীয় হয়। তবে শুধু নাম না, চাএর বিভন্ন রকমফের গুলি ছাড়াও সাথে রয়েছে “টা” এর ও ব্যবস্থা…
চা এর রকমফের :
র চা, চিনি ছাড়া চা, মালাই চা ছাড়াও রয়েছে আরো নানারকম চায়ের সমারোহ। সুন্দর ভাঁড়ে করে পরিবেশন করা চায়ের দাম শুরু হয় মাত্র ১০ টাকা থেকে।

অন্যান্ন :
চা ছাড়াও এখানে রয়েছে রোল এবং স্যান্ডউইচ এর ভ্যারাইটি। এগরোল পেয়ে যাবেন এখানে মাত্র ৪০ টাকায় যা এখন অন্য কোনো জায়গায় প্রায় অসম্ভব। এছাড়াও রয়েছে ডাবল এগরোল ৫০ টাকা, এগ চিকেন রোল ৮০ টাকায় মাত্র। এছাড়া রয়েছে স্যান্ডউইচ এর বিভিন্ন আইটেম যেমন ভেজ স্যান্ডউইচ ৩৫ টাকা, চিজ স্যান্ডউইচ ৪৫ টাকা, কর্ন স্যান্ডউইচ ৪৫ টাকা, চিকেন স্যান্ডউইচ ৬০ টাকা।
শুধু দাম কমই না, ওনারা খাবারের স্বাদ এবং পরিচ্ছন্নতার দিকেও বিশেষ নজর রেখেছেন। তাই কোনো একটা ছুটির বিকেলে চায়ের সন্ধানে চলে যেতেই পারেন চিংড়িঘাটার “ফালতু চায়” তে চা খেতে।
ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।
মনে রাখবেন “Life is like a cup of tea; it’s all in how you make it.”
ভবঘুরের পক্ষ থেকে সবার জন্য শুভকামনা রইলো।
ধন্যবাদ।

