loader image
A majestic granite monolith of Joychandi Pahar in Purulia, West Bengal, featuring rugged rock formations, lush green vegetation, and a clear sky, famously known as a rock climbing destination and Satyajit Ray film location.

জয়চণ্ডী পাহাড়: পুরুলিয়ার কোলে ‘হীরক রাজার দেশে’ এক উইকএন্ড সফর

বসের ইমেল, বউয়ের (বা গার্লফ্রেন্ডের) মান-অভিমান আর শহরের প্যাঁচপ্যাঁচে জ্যাম—সব কিছুকে এক সপ্তাহের জন্য ‘বগলদাবা’ করে যদি কোথাও পালাতে চান, তবে পুরুলিয়ার জয়চণ্ডী পাহাড় আপনার জন্য ‘পারফেক্ট’ দাওয়াই। কেন? কারণ এখানে পাহাড় আছে, ইতিহাস আছে, আর আছে আপনার ফিটনেস টেস্ট করার জন্য ৫২০টি খতরনাক সিঁড়ি!
​আমরা যারা একটু আধটু ঘুরতে ভালোবাসি, তাদের কাছে পুরুলিয়া মানেই তো পলাশ আর রুক্ষ লাল মাটি। কিন্তু জয়চণ্ডী পাহাড় একটু স্পেশাল। কেন স্পেশাল? চলুন, এক কাপ চা নিয়ে বসে পড়ুন, পুরো ট্যুরটা আগে কাগজ-কলমে (থুড়ি, মোবাইল স্ক্রিনে) সেরে নিই।

​সত্যজিৎ রায় আর আমাদের ‘উদয়ন পণ্ডিত’

​মনে আছে সেই ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাটা? উদয়ন পণ্ডিত যেখানে গুহায় লুকিয়ে থাকতেন, আর মগজধোলাইয়ের সেই অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা? হ্যাঁ মশাই, সেই সিনেমার আসল হিরো কিন্তু এই জয়চণ্ডী পাহাড়ই! পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে হাঁটলে আপনার মনে হবে, এই বুঝি কোনো বড় পাথরের আড়াল থেকে জাদুকর বেরিয়ে আসবে। সিনেমার সেই গুহাটা খুঁজতে গিয়ে আমরা অনেকেই নিজেদের উদয়ন পণ্ডিত ভাবতে শুরু করি, যদিও শেষে দেখা যায় গুহার বদলে কেবল বুনো ঝোপ আর কিছু বানর বাবাজির দেখা মিলেছে!

A rustic outdoor rest area at Joychandi Pahar in Purulia, featuring people sitting at wooden tables under a canopy of trees next to a large granite rock formation.

​৫২০ সিঁড়ির ‘অগ্নিপরীক্ষা’

​পুরুলিয়ার এই পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে গেলে আপনাকে ৫২০টি সিঁড়ি টপকাতে হবে। যারা জিম বলতে কেবল ‘সুগার ফ্রি’ বিস্কুট বোঝেন, তাদের জন্য এটা কিন্তু সত্যিকারের অগ্নিপরীক্ষা। সিঁড়ির মাঝামাঝি গিয়ে আপনার মনে হবে— “কেন এলাম? ঘরে বসে নেটফ্লিক্স দেখলেই তো হতো!” কিন্তু দয়া করে হাল ছাড়বেন না।
​আশেপাশে দেখবেন আপনার চেয়ে দ্বিগুণ বয়সের মাসিমা-মেসোমশাইরা ‘জয় মা চণ্ডী’ বলে হুড়মুড়িয়ে উঠে যাচ্ছেন। তখন নিজের ইগোতে একটু লাগাটাই স্বাভাবিক! অর্ধেক পথে উঠে যখন নিচের গ্রামগুলো ছোট হতে শুরু করবে আর ফুরফুরে হাওয়া আপনার ঘাম মুছিয়ে দেবে, তখন মনে হবে— ‘নাহ, কষ্টটা সার্থক!’

​পাহাড়ের মাথায় পৌঁছে: স্বর্গ কি তবে এখানেই?

​চূড়ায় ওঠার পর যখন দেবী জয়চণ্ডীর মন্দিরে পৌঁছাবেন, এক অদ্ভুত শান্তি পাবেন। পাহাড়ের ওপর থেকে দিগন্ত বিস্তৃত পুরুলিয়ার নীল আকাশ আর রুক্ষ মাঠের ভিউ দেখলে মনে হবে, পৃথিবীর সব টেনশন ওই নিচে ফেলে এসেছেন। আপনি যদি ফটোগ্রাফির শৌখিন হন, তবে এটা আপনার জন্য খনি। সূর্যাস্তের সময় আকাশটা যখন বেগুনী আর কমলা রঙের খিচুড়ি পাকায়, তখন সেলফি তুলতে গিয়ে আপনার মেমোরি ফুল হয়ে যাবে নিশ্চিত!
​কীভাবে যাবেন? (বাজেট আর আয়েশ—দুটোই আছে)

The Chandi Mata Temple at the summit of Joychandi Pahar in Purulia, West Bengal, featuring white domes with red accents, orange flags, and devotees resting in the open-air pavilion against a clear sky.

​ট্রেন যাত্রা (সবচেয়ে সস্তা ও রোমাঞ্চকর):

হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে সোজা উঠে পড়ুন আদ্রা বা জয়চণ্ডী পাহাড় প্যাসেঞ্জারে। স্টেশনে নামার পর যখন টোটোওয়ালা আপনাকে বলবে, “চলুন বাবু পাহাড় দেখিয়ে দিই,” বুঝবেন আপনার অ্যাডভেঞ্চার শুরু। ট্রেন থেকে মুড়ি-চপ আর চা খেতে খেতে যাওয়ার মজাই আলাদা।

​বাইক বা গাড়ি (রাজকীয় মেজাজ):

আপনি যদি আমাদের মতো নিজের গাড়িতে বা বাইকে যেতে চান, তবে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে আদ্রার পথ ধরুন। দূরত্ব প্রায় ২৬০ কিমি। পথে শক্তিগড়ের ল্যাংচা আর দুর্গাপুরের ধাবার কষা মাংস না খেলে কিন্তু ভবঘুরে হওয়া বৃথা! তবে মনে রাখবেন, পুরুলিয়ার রোদে চাকা পাংচার হলে কিন্তু ‘হীরক রাজা’ও বাঁচাতে আসবে না, তাই গাড়ি আগে চেক করে নেবেন।

​আশেপাশের ‘প্লাস-ওয়ান’ স্পটগুলো

​জয়চণ্ডী একা কেন থাকবে? তার সাথী হিসেবে আছে আরও কিছু দারুণ জায়গা:
১. বড়ন্তি (Baranti): জয়চণ্ডী থেকে একটু দূরেই একটা বিশাল লেক আর পাহাড়। বিকেলের দিকে ওখানে বসে ডাবের জল (বা অন্য কোনো লিকুইড!) খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখা মানেই স্বর্গ।
২. গড়পঞ্চকোট: রাজবাড়ি আর পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ। ইতিহাস আর ভূতের গল্প—দুটোই এখানে ফ্রি পাওয়া যায়।
৩. রঘুনাথপুরের সিল্ক: মা-বউকে খুশি রাখতে হলে এখান থেকে একটা তসর বা সিল্কের শাড়ি কিন্তু কিনতেই হবে। নইলে বাড়িতে ঢুকে ‘মগজধোলাই’ অবধারিত!

​পেটপুজো: পোস্ত ছাড়া পুরুলিয়া? অসম্ভব!

​পুরুলিয়া যাবেন আর পোস্ত খাবেন না? তা হয় নাকি! জয়চণ্ডী পাহাড়ের নিচের ভাতের হোটেলগুলোতে একবার খোঁজ নিয়ে দেখুন। গরম ভাতে আলু পোস্ত, ঝিঙে পোস্ত আর সাথে দেশি মুরগির ঝোল। শেষে এক বাটি চাটনি আর পাপড় ভাজা। এই খাওয়ার পর পাহাড় চড়া তো দূর, একটা লম্বা ঘুম দেওয়ার ইচ্ছে করবে আপনার।

A scenic view of Baranti Lake and Baranti Hill in Purulia, West Bengal, featuring a red dirt road alongside a calm reservoir under a cloudy sky, surrounded by lush green forests.
Image Courtesy: Biswajit Majumdar

ট্যুর টিপস (ভবঘুরে স্পেশাল):
​জুতো: হিল তোলা জুতো পরে পাহাড় চড়ার বিলাসিতা করতে যাবেন না, তাহলে সিঁড়িতেই ‘ব্রেক ডান্স’ শুরু হয়ে যাবে। ভালো স্নিকার্স মাস্ট।
​সময়: মে-জুন মাসে পুরুলিয়া মানেই যমের দুয়ার। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ হলো সেরা সময়, যখন চারপাশ পলাশ ফুলে লাল হয়ে থাকে।
​জঞ্জাল: আমরা ভবঘুরে, নোংরা করার লোক নই। চিপসের প্যাকেট বা জলের বোতল পাহাড়ে ফেলে আসবেন না প্লিজ!

শেষকথা:
জীবনটা বড্ড ছোট, আর দুনিয়াটা বড্ড বড়। জয়চণ্ডী পাহাড় আপনাকে শেখাবে যে অল্প পরিশ্রমেও বড় আনন্দ পাওয়া যায়। তাই ক্যালেন্ডারে একটা উইকএন্ড লাল কালি দিয়ে গোল করে দিন, ব্যাগটা গুছিয়ে নিন আর বেরিয়ে পড়ুন। হীরক রাজার দেশে আপনার জন্য অনেক ম্যাজিক অপেক্ষা করছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top