বাঙালির পায়ের তলায় সর্ষে— এ কথা কে না জানে! সুযোগ পেলেই পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়া আমাদের মজ্জাগত স্বভাব। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই যে এত মানুষ পাহাড়, সমুদ্র বা জঙ্গলে ছুটে যাচ্ছেন, তাঁদের সবার ঘোরার উদ্দেশ্য বা ধরন কি এক? একেবারেই নয়! দীর্ঘদিনের ঘোরাঘুরি আর নানারকম মানুষের সাথে মেশার পর, আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, ট্রাভেলারদের মূলত তিনটি মজাদার ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। আপনি, আপনার বন্ধু বা পরিবারের সদস্য— সবাই কোনো না কোনো ক্যাটাগরির মধ্যে পড়বেনই। চলুন মিলিয়ে নেওয়া যাক!
১. র্যাশ ট্রাভেলিং (Rash Traveling):
“ঘুমিয়ে কাজ নেই, সব কটা স্পট আজকেই দেখতে হবে!”
এঁদের জীবনের মূল মন্ত্র হলো— “সময় কম, কিন্তু দুনিয়াটা অনেক বড়!” সাধারণত স্টুডেন্ট লাইফ বা সদ্য চাকরি পাওয়া জীবনে, যখন বাজেট বেশ টাইট কিন্তু এনার্জি অফুরন্ত থাকে, তখন এই ধরনের ট্রাভেলিং বেশি দেখা যায়। এঁরা ঘোরার জায়গায় পৌঁছে হোটেলে চেক-ইন করার আগেই সাইটসিন শুরু করে দেন। ঠিকমতো খাওয়া জুটল কি জুটল না, বা রাতের ঘুম পুরো হলো কি না— তাতে এঁদের কিচ্ছু যায় আসে না। এঁদের কাছে ট্যুর মানে হলো একটা চেকলিস্ট— আজ টাইগার হিল, কাল মিরিক, পরশু ঘুম মনাস্ট্রি! এক দিনে ১০টা স্পট কভার করতে গিয়ে এঁরা নিজেদের রীতিমতো মেশিনে পরিণত করেন। এঁদের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে অনেক সময় সঙ্গীদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যায়।

২. মিডি বা ব্যালেন্সড ট্রাভেলিং (Mixed Traveling):
“আরামও হবে, ঘোরাও হবে, আবার মন চাইলে রাস্তাও বদলাবে!”
এঁরা হলেন ঘোরার দুনিয়ার সবচেয়ে পরিণত এবং ব্যালেন্সড মানুষ। এঁরা বোঝেন যে ভ্রমণ মানে শুধুই গাধার খাটুনি নয়, আবার শুধুই বিছানায় পড়ে থাকাও নয়। এঁরা ঘোরার নেশা এবং শারীরিক আরাম— এই দুইয়ের মাঝে একটা চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখেন। এঁরা হয়তো সকালে রিল্যাক্স করে ব্রেকফাস্ট করে বেরোবেন, তিনটে স্পট দেখবেন, আবার বিকেলে ফিরে এসে নিজের মতো সময় কাটাবেন। এঁদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো— এঁরা অসম্ভব রোমান্টিক এবং খেয়ালি হন। ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ যদি পাহাড়ের বাঁকে একটা ছোট্ট ঝরনা বা নদীর ধারের কোনো নিরিবিলি জায়গা এঁদের মনে ধরে যায়, তবে লিস্টের বাকি নামিদামি সাইটসিনগুলো এঁরা হাসিমুখে ক্যানসেল করে দেন। ওই একটা জায়গাতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়াতেই এঁদের আসল আনন্দ। রথ দেখা কলা বেচার মতো ব্যাপার আর কি!
আমাদের ৫০০০০ কিলোমিটার bike ride আর না-জানি-কত কিলোমিটার ট্রেন-বাস-প্লেনে ঘোরার সময় আমাদের চোখে দেখা সহযাত্রীদের চরিত্র বিশ্লেষণ করে এটা আমাদের অভিজ্ঞতা। বাইক রাইড থেকে মনে পড়লো, আপনি কি নতুন motorbike কিনবেন ভাবছেন? একবার তার আগে ঝট করে দেখে নিতে পারেন আমাদের suggestion এর কিছু trip-ready বাইক, নিচের পোস্টে।
৩. রিল্যাক্সড ট্রাভেলিং (Relaxed Traveling):
“দেদার খাব, এন্তারে ঘুমাব আর ব্যালকনি থেকে ভিউ দেখব!”
কট্টর ব্যাকপ্যাকার বা অ্যাডভেঞ্চার-প্রেমীদের মতে, এঁরা আসলে ঠিক ‘ট্রাভেলার’ পদবাচ্য নন। এঁরা হলেন খাঁটি ‘হলিডে মেকার’ (Holiday Maker)। মূলত যাঁদের পকেটের জোর বেশ ভালো, কিন্তু স্বভাবে চরম অলস (অথবা কাজের চাপে এতটাই ক্লান্ত যে আর হাঁটাহাঁটি চাইছেন না), তাঁরাই এই পথ বেছে নেন। এঁরা সচেতনভাবে এমন ডেস্টিনেশন বাছেন যেখানে স্পট কভার করার কোনো তাড়া নেই, বা ট্রেকিং করার কোনো ব্যাপার নেই। সোজা গিয়ে কোনো ভালো বা বিলাসবহুল রিসোর্টে চেক-ইন করাটাই এঁদের প্রথম কাজ।
আচ্ছা, রিসোর্ট বলতে মনে পড়লো, বুকিং করার আগে একবার checklist টা মিলিয়ে নিতে ভুলবেন না যেন। হোমস্টে বুকিং করে পস্তাতে চান না? টাকা দেওয়ার আগে মালিককে এই ১০টি প্রশ্ন করেছেন তো?
আচ্ছা, এঁদের ল্যাদখোর বলাটা বোধহয় শুনতে ভালো লাগে না, তাই না? সে যাক, এরপর রুটিন একেবারেই সিম্পল— কবজি ডুবিয়ে লোকাল খাবার খাওয়া, নরম বিছানায় শুয়ে জানালা বা ব্যালকনি থেকে সমুদ্রের ঢেউ বা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা, আর জমিয়ে রিল্যাক্স করা। ফেরার আগে লোকাল মার্কেট থেকে ব্যাগভর্তি শপিং করাটা এঁদের ট্রিপের সবচেয়ে অ্যাক্টিভ পার্ট!
By the way, আমরা কিন্তু দেড় নম্বর দলের, মানে এক আর দুনম্বরের মাঝামাঝি আর কি। ঝটিতি সফরে গিয়ে ঘুরে আসাটাই আমাদের দস্তুর – মানে ওই অফিসের ছুটি যেটা সাপোর্ট করে আর কি… তাই ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ যদি পাহাড়ের বাঁকে একটা ছোট্ট ঝরনা বা নদীর ধারের কোনো নিরিবিলি জায়গা মনে ধরে যায়ও, তাহলেও সেখানে দুদন্ডের বেশি বসে থাকার উপায় থাকে না। তবে, তার জন্যে হয়তো কোনো কোনো ট্রিপে একটা-দুটো স্পট মিস হয়ে যায়।
ঘুরতে ভালোবাসা মানুষ হিসেবে বয়সের সাথে বা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে আপনার বিবর্তনও হয়তো এই তিনটে ধাপ মেনেই হয়েছে বা হচ্ছে। আপনার ঘোরার স্টাইল ঠিক কেমন? আপনি কি ব্যাকপ্যাক কাঁধে ‘র্যাশ’ ট্রাভেলার, খেয়ালি ‘মিডি’ নাকি আরামপ্রিয় ‘রিল্যাক্সড’ পর্যটক? কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানান, আর বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে তাঁদের আসল রূপটাও ফাঁস করে দিন!




