গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতির ঘণ্টা-কাঁসরের ধ্বনি, দশাশ্বমেধ ঘাটের স্নিগ্ধ বাতাস আর মগনলাল মেঘরাজের কচৌরি গলি—কলকাতা থেকে কাশীর টান বাঙালির চিরন্তন। কিন্তু ১৬-১৮ ঘণ্টার ক্লান্তিভরা দীর্ঘ পথ আর যানজটের কথা ভেবে অনেকেই ব্যক্তিগত গাড়িতে এই দীর্ঘ রোড ট্রিপের প্ল্যান বাতিল করে দেন। তবে রোড ট্রিপ ভালোবাসেন এমন যাযাবর মনের মানুষদের জন্য দারুণ আশার খবর নিয়ে হাজির হয়েছে ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (NHAI)।
দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হতে চলেছে স্বপ্নের বারাণসী–কলকাতা সিক্স-লেন গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ে (Varanasi–Kolkata Expressway)। সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডের চাতরা জেলায় শুরু হয়ে গেছে মাটি পরীক্ষার (Soil Testing) চূড়ান্ত কাজ।
গ্রাউন্ড রিয়ালিটি: চাতরায় জোরকদমে মাটি পরীক্ষা
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক এবং ভূমি অধিগ্রহণ বিভাগের প্রাথমিক ছাড়পত্র মেলার পরেই পুরো প্রকল্পটির কাজে গতি এসেছে। বর্তমানে চাতরা–ইটখোরি প্রধান সড়কের তাপেজের কাছে জোরকদমে চলছে মাটি পরীক্ষার কাজ। নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির বহন ক্ষমতা (Load Bearing Capacity) ও ভৌগোলিক চরিত্র যাচাই করে তবেই রাস্তার স্তর বিন্যাস ও ব্রিজ-কালভার্ট তৈরির নকশা চূড়ান্ত করা হয়। এই পর্বটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলেই মূল সড়ক নির্মাণের ভারী যন্ত্রপাতি মাঠে নামবে।
রুট ও বিস্তার: কোন কোন জেলার ওপর দিয়ে ছুটবে গাড়ি?
উত্তর প্রদেশের পবিত্র শহর বারাণসী থেকে শুরু হয়ে এই অ্যাক্সেস-কন্ট্রোলড গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়েটি শেষ হবে পশ্চিমবঙ্গের উলুবেড়িয়া/বাগনানের কাছে এসে।
- উত্তর প্রদেশ: বারাণসী ও চান্দৌলি।
- বিহার: কৈমুর, রোহতাস, ঔরঙ্গাবাদ এবং গয়া।
- ঝাড়খণ্ড: চাতরা, হাজারিবাগ, রামগড় এবং বোকারো।
- পশ্চিমবঙ্গ: পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং হাওড়া।
পুরো এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৬১০–৬২০ কিলোমিটার, যার মধ্যে কেবল ঝাড়খণ্ডের চাতরা জেলাতেই বিস্তৃত থাকবে প্রায় ৮৪ কিলোমিটার অংশ। এই সড়ক চাতরার মোট ৬৭টি গ্রামের ওপর দিয়ে প্রসারিত হবে (চাতরা ব্লকে ১৮টি, হান্টারগঞ্জে ২৮টি, পাথালগড্ডায় ২টি এবং সিমারিয়ায় ১৯টি গ্রাম)।
ঝাড়খণ্ডে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ জংশন
এক্সপ্রেসওয়েটি এমনভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে আশেপাশের প্রধান শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলো সহজে এই করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ঝাড়খণ্ড অংশে মোট ৬টি ইন্টারচেঞ্জ/জংশন তৈরি করা হচ্ছে:
- চাতরা জেলা (২টি): ডাঁড়া এবং সিমারিয়া।
- হাজারিবাগ জেলা (১টি): স্থানীয় সংযোগের সুবিধার্থে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট।
- রামগড় জেলা (১টি): শিল্পাঞ্চল ও কয়লা বেল্টের সাথে সংযোগকারী।
- বোকারো জেলা (২টি): ইস্পাত নগরী ও ধানবাদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ট্রাফিক প্রবাহের জন্য।
ডাঁড়া গ্রামে অত্যাধুনিক NHAI ক্যাম্প অফিস ও ওয়েসাইড অ্যামেনিটিজ
সদর ব্লকের ডাঁড়া গ্রামে তৈরি হতে চলেছে একটি স্থায়ী NHAI ক্যাম্প অফিস, যেখান থেকে ঝাড়খণ্ড ও বিহার সংলগ্ন প্রকল্পগুলির সার্বিক তদারকি ও নজরদারি চালানো হবে।
দূরপাল্লার রোড ট্রিপারদের জন্য আরও সুখবর—এই ক্যাম্পের পাশেই তৈরি হবে অত্যাধুনিক Wayside Amenities (পথচলতি পরিষেবা কেন্দ্র)। সেখানে থাকবে:
- পারিবারিক রেস্তোরাঁ ও ফুড কোর্ট
- পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুম ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের জন্য শৌচাগার
- ২৪×৭ এমার্জেন্সি অ্যাম্বুলেন্স ও ট্রমা কেয়ার ইউনিট
- হোটেল ও বিশ্রামাগার
- জ্বালানি ও ভেহিকল চার্জিং/সার্ভিসিং পয়েন্ট
প্যাকেজ ও বরাদ্দের আর্থিক খতিয়ান
ভারতমালা পরিযোজনার (Bharatmala Pariyojana) অধীনে ঝাড়খণ্ড অংশটিকে মোট ৬টি প্যাকেজে ভাগ করে কাজ চলছে:
| প্যাকেজ নম্বর | অন্তর্ভুক্ত জেলা | আনুমানিক বরাদ্দ |
| প্যাকেজ ৮, ৯ ও ১০ | চাতরা জেলা | ₹২,৮৫৯ কোটি |
| প্যাকেজ ১১ | হাজারিবাগ জেলা | ₹১,২৫৬ কোটি |
| প্যাকেজ ১২ | রামগড় জেলা | ₹৭১৮ কোটি |
| প্যাকেজ ১৩ | বোকারো জেলা | ₹১,৩১৭ কোটি |
কেবল ঝাড়খণ্ড অংশেই জমি অধিগ্রহণ ও পরিকাঠামো নির্মাণে খরচ হচ্ছে ৬,০০০ কোটি টাকারও বেশি।
এক নজরে বারাণসী–কলকাতা এক্সপ্রেসওয়ে
| বৈশিষ্ট্য | বিশদ বিবরণ |
| প্রকল্পের ধরন | ৬-লেন বিশিষ্ট অ্যাক্সেস-কন্ট্রোলড গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ে |
| মোট আনুমানিক দৈর্ঘ্য | ~৬১০ থেকে ৬২০ কিমি |
| গতিসীমা (ডিজাইন স্পিড) | ১০০–১২০ কিমি/ঘণ্টা |
| প্রত্যাশিত যাত্রার সময় | কলকাতা থেকে কাশী পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা (বর্তমানে লাগে প্রায় ১৪-১৬ ঘণ্টা) |
| প্রধান সংযোগকারী করিডোর | উত্তর প্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ |
স্মার্ট ট্রাভেলার গাইড (Bhoboghure™ Insights)
- ভ্রমণের মানে বদল: কলকাতা থেকে সকালে বেরিয়ে দুপুরের খাবার ঝাড়খণ্ডের কোনো ধাবায় খেয়ে বিকেলের মধ্যেই বারাণসীর ঘাটে পৌঁছে সন্ধ্যারতি দেখা এখন আর অলীক কল্পনা থাকবে না।
- অফবিট ট্রাভেলের প্রসার: এই এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে বিহারের রোহতাস কেল্লা, গয়ার ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন কিংবা ঝাড়খণ্ডের ইটখোরির প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক বৌদ্ধ-হিন্দু-জৈন কমপ্লেক্সে পর্যটকদের পৌঁছানো আগের চেয়ে বহুগুণ সহজ হবে।
- নিরাপত্তা ও গতি: গ্রিনফিল্ড ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোলড হওয়ায় কোনো স্থানীয় ভিড়ভাট্টা বা অযাচিত কাট-পয়েন্ট থাকবে না, যা ব্যক্তিগত চারচাকার গাড়িতে লং ড্রাইভের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক মানের করবে।
একনজরে FAQ
১. এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে কলকাতা থেকে বারাণসী পৌঁছাতে কত সময় বাঁচবে?
বর্তমানে পুরানো NH-19 (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) দিয়ে যেতে ভারী ট্রাকের ভিড় ও যানজট মিলিয়ে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে। এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হলে এটি কমে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টায় নেমে আসবে।
২. এটি কি বর্তমান NH-19-এর সম্প্রসারণ?
না, এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন ‘গ্রিনফিল্ড’ এক্সপ্রেসওয়ে। অর্থাৎ জনবসতিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে সম্পূর্ণ নতুন অ্যালাইনমেন্ট ধরে চাষের জমি ও ফাঁকা অঞ্চলের ওপর দিয়ে এটি তৈরি হচ্ছে।
৩. বারাণসী-কলকাতা এক্সপ্রেসওয়ে পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন জেলার ওপর দিয়ে যাবে এবং বর্তমান অগ্রগতি কেমন?
পশ্চিমবঙ্গে বারাণসী–কলকাতা ৬-লেন গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ের (NH-319B) কাজ অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে। উত্তর প্রদেশ, বিহার ও ঝাড়খণ্ডে নির্মাণ ও পাইলিংয়ের কাজ জোরকদমে চললেও পশ্চিমবঙ্গে রুট অ্যালাইনমেন্টে পরিবর্তন এবং জমি অধিগ্রহণের কারণে সার্বিক প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
ঝাড়খণ্ডের বোকারো সীমান্ত পেরিয়ে এক্সপ্রেসওয়েটি পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করবে। রাজ্যজুড়ে এটি প্রায় ২৪২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করবে। মূলত দক্ষিণবঙ্গের ৫টি প্রধান জেলা এবং প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ অনুযায়ী মোট ৬টি জেলা এর আওতায় আসছে:
- পুরুলিয়া: ঝাড়খণ্ড সীমান্ত (কমলাপুর/গুড়িডিহ) পেরিয়ে সড়কটি প্রথমে পুরুলিয়া জেলায় ঢুকবে।
- বাঁকুড়া: পুরুলিয়া হয়ে এটি বাঁকুড়ার বনাঞ্চল ও গ্রামীণ বেল্ট অতিক্রম করবে।
- পশ্চিম মেদিনীপুর: বাঁকুড়া ও হুগলির সংযোগকারী প্রান্ত দিয়ে জেলার উত্তর-পূর্বাংশ ছুঁয়ে যাবে।
- হুগলি: আরামবাগ মহকুমা এবং চণ্ডীতলা ব্লকের গ্রামীণ অংশের ওপর দিয়ে রুটটি ছড়ানো।
- হাওড়া: মূল পরিকল্পনার টার্মিনাল পয়েন্ট হিসেবে হাওড়ার উলুবেড়িয়া ও বাগনানের কাছে ১৬ নম্বর জাতীয় সড়কের (NH-16) সাথে এটি যুক্ত হওয়ার কথা।
- দক্ষিণ ২৪ পরগনা (সংশোধিত অংশ): রাজ্য সরকারের প্রস্তাবিত নতুন রুটে হুগলি নদীর ওপর দিয়ে একটি নতুন কেবল সেতু তৈরি করে বাগনান থেকে সরাসরি দক্ষিণ ২৪ পরগনার পুজালি ও সারিশা (ডায়মন্ড হারবার রোড)-এর দিকে সংযোগ সম্প্রসারণের নকশা রাখা হয়েছে।
শেষকথা
সাধারণত এরকম নিউস আর্টিকেল লেখা আমাদের ধাতে যায় না, তাও এই খবরটা পেয়ে আর ধৈর্য্য রাখতে না পেরে শেয়ার করলাম। কাশি যাওয়ার জন্য ট্রেনের কনফার্মড টিকিট না পাওয়ার দিন এবার ফুরোতে চলেছে। ঝাড়খণ্ডের পাথুরে মাটি কেটে যখন এক্সপ্রেসওয়ের মসৃণ অ্যাসফল্টের ফিতে পাতা হয়ে যাবে, তখন উইকেন্ডের স্টিয়ারিং হাতে বেরিয়ে পড়া হবে স্রেফ কয়েক ঘণ্টার সিদ্ধান্ত!
আপনি কি প্রস্তুত কলকাতা-বারাণসী এই রোমাঞ্চকর এক্সপ্রেসওয়েতে লং ড্রাইভের জন্য? আপনার মতামত কমেন্টে আমাদের জানান।




