loader image
ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ – গোধূলিবেলায় ইছামতী নদীতে দুর্গা প্রতিমা ও ঐতিহ্যবাহী নৌকো

ইছামতীর বিসর্জন ও টাকি ডে-ট্রিপ গাইড: কাঁটাতার, নদী আর বিজয়ার স্মৃতি

কলকাতা থেকে মাত্র পঁচাত্তর কিলোমিটার দূরে ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ এক অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি এনে দেয়। নদী কোনো দেশের কাঁটাতার চেনে না। জলধারা বয়ে চলে নিজের খেয়ালে। অথচ সেই নদীর বুকেই এক অদৃশ্য দাগ টেনে দুই বাংলাকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। কিন্তু আশ্বিনের এক মন কেমন করা বিকেলে, বিজয়া দশমীর দিনে, যখন দুই পারেই একসঙ্গে বেজে ওঠে বিদায়ের ঢাক, তখন সীমানা যেন এক লহমায় ফিকে হয়ে যায়। কলকাতা থেকে কম সময়ে নিরিবিলি ঘুরে আসার জন্য ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ ভ্রমণরসিকদের কাছে বরাবরই খুব প্রিয়।

কলকাতা থেকে মাত্র পঁচাত্তর কিমি দূরে উত্তর চব্বিশ পরগনার শান্ত শহর টাকি। সারা বছর এই জায়গা নিঝুম নদীর টানে চেনা হলেও, দশমীর দিনে এখানে জমে ওঠে এক মহা মিলনমেলা।

এক নজরে টাকি সফর

বিষয়বিবরণ
দূরত্বশিয়ালদহ বা কলকাতা থেকে প্রায় ৭৫ কিমি
যাওয়ার সেরা সময়শরৎ থেকে শীতকাল (বিশেষ করে বিজয়া দশমী)
যাতায়াতহাসনাবাদ লোকাল ট্রেন অথবা নিজের গাড়ি বা বাইক
ভ্রমণের ধরনএক দিনের সফর (ডে ট্রিপ)
মাথাপিছু খরচট্রেনে গেলে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা; গাড়ি ও নৌকো নিলে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা
জরুরি নথিভোটার কার্ড বা আধার কার্ড

ইছামতীর বিজয়া দশমী: আগের দিন আর আজকের নিয়ম

আগে দশমীর বিকেলে ইছামতীর বুকে এক বাঁধভাঙা দৃশ্য দেখা যেত। এপার বাংলার টাকি আর ওপার বাংলার দেবহাটা—দুই দেশের শত শত নাও মাঝনদীতে এসে মিলত। নৌকো থেকে নৌকোয় নাড়ু-মিঠাই বিলি হতো, দুই পারের মানুষ মেতে উঠতেন কোলাকুলিতে।

এখন নিয়মের কড়াকড়ি অনেক বেড়েছে। দুই দেশের সীমান্ত পাহারা বাহিনী (বিএসএফ ও বিজিবি) কড়া নজর রাখে।

  • ভারতীয় নৌকো থাকে এপারে, ওপার বাংলার নাও ভাসে তাদের সীমানায়।
  • মাঝনদীতে আগের মতো মেলামেশা এখন আর করা যায় না।
  • তবে দূর থেকে হাত নাড়া, দুই পারের মানুষের বিজয়ার আনন্দ আর নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য আজও দেখার মতো।
A detailed close-up portrait of the Goddess Durga idol from Belur Math. She has a vibrant yellow face, dramatic eye makeup, a nose ring, and a third eye. She wears elaborate gold necklaces, heavy earrings, a large pink and gold crown, and silver ornamental decorations around her shoulders. She holds traditional items like a shield and trident. Fresh floral garlands hang around her neck. The background is a colorful traditional painting featuring a white cow.
বেলুড় মঠের শারদোৎসব: তপ্তকাঞ্চনবর্ণা মুখে শান্ত দৃষ্টি আর সাবেকি ডাকের সাজে চিন্ময়ী মা দুর্গা

সীমান্তের শান্ত ইছামতীর বুকে মেঠো আমেজের এই ভাসান দেখার পাশাপাশি, আপনি যদি কলকাতার বুকে একটু রাজকীয় মেজাজে বিজয়া উপভোগ করতে চান, তবে গঙ্গার জলে বিলাসবহুল ভেসেল বা বোটে ভেসে নিরঞ্জন দেখার মজাও কিন্তু অনন্য। শহরের আলো আর ঢাকের আওয়াজে ঘাটগুলোর বিসর্জন চাক্ষুষ করতে দেখে নিতে পারেন আমাদের কলকাতার দুর্গাপূজা বিসর্জন Cruise গাইড।

কলকাতা থেকে টাকি কীভাবে যাবেন?

১. লোকাল ট্রেনে (সবচেয়ে সস্তা ও সহজ উপায়)

শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোকাল ট্রেনের দৈনিক সময়সূচি ও প্ল্যাটফর্ম জানতে ভারতীয় রেলওয়ের অফিশিয়াল পোর্টাল-এ নজর রাখতে পারেন। একটু সকাল সকাল রওনা দিলে এই ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ কোনো রকম ক্লান্তি ছাড়াই দারুণভাবে উপভোগ করা সম্ভব।

  • স্টেশন থেকে বের হলেই পেয়ে যাবেন সার দিয়ে দাঁড়ানো টোটো বা ভ্যান।
  • টোটো ভাড়া করে সোজা চলে যাওয়া যায় নদীর ঘাট কিংবা রাজবাড়ি এলাকায়।

২. সড়কপথে (গাড়ি বা বাইকে)

কলকাতা থেকে দুটি ভালো রাস্তা রয়েছে:

  • রুট ১ (বাসন্তী হাইওয়ে হয়ে): সায়েন্স সিটি > বাসন্তী হাইওয়ে > ভোজেরহাট > হাড়োয়া > বসিরহাট > টাকি। এই পথে শহরের জ্যাম এড়িয়ে খোলামেলা মেঠো পথ ধরে যাওয়া যায়।
  • রুট ২ (বারাসাত হয়ে): ভিআইপি রোড > বারাসাত ডাকবাংলো মোড় > দেগঙ্গা > বসিরহাট > টাকি। এই রুটে বারাসাত ও দেগঙ্গায় গাড়ির চাপ কিছুটা বেশি থাকে। সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা।

টাকির দর্শনীয় স্থান: এক দিনে কী কী দেখবেন?

টাকি মানে কেবল নদী নয়, এখানে জড়িয়ে আছে বহু পুরানো দিনের ইতিহাস।

টাকি রোড স্টেশন 
       │
       ├──> গোলপাতার বন (ছোট সুন্দরবন)
       ├──> রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি ও নাটমন্দির
       ├──> জোড়া শিবের দেউল ও কুলেশ্বরী কালীবাড়ি
       └──> ইছামতীর ঘাট ও সূর্যাস্ত

১. গোলপাতার বন (ছোট সুন্দরবন)

টাকির অন্যতম বড় আকর্ষণ এই গোলপাতার বন। সুন্দরবনের একটি ছোট রূপ বলা চলে একে। বনের ভেতর বাঁশের তৈরি সাঁকো দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অনুভূতি চমৎকার।

জরুরি কথা: গোলপাতার বনে ঢুকতে হলে আসল আধার কার্ড বা ভোটার কার্ড সাথে থাকা চাই। সীমান্ত চৌকিতে নাম নথিভুক্ত না করে ভেতরে ঢোকা যায় না।

২. রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি ও নাটমন্দির

টাকির রায়চৌধুরী বাড়ির নামডাক বহু কালের। তাঁদের পুরানো দালান, ঠাকুরদালান আর নাটমন্দির আজও সাবেক আভিজাত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিজয়া দশমীতে এই বাড়ির পুজো দেখার মতো ভিড় হয়।

৩. জোড়া শিবের দেউল ও কুলেশ্বরী কালীবাড়ি

প্রায় তিনশো বছরের পুরানো জোড়া শিবমন্দির। লাল ইটের সুন্দর কারুকাজ দেখতে বেশ লাগে। কাছেই রয়েছে জাগ্রত কুলেশ্বরী কালীবাড়ি।

৪. ইছামতীর ঘাট ও বিকেল বেলার হাওয়া

ঘাটে বসে ওপারের সবুজ গ্রাম দেখা আর বিকেলে নদীর বুকে সূর্যাস্ত দেখা—শহরের সব ক্লান্তি এক নিমেষে মুছে দেয়।

পেটপুজো: ইছামতীর মাছ ও টাকির ছানাপোড়া

ঘোরাঘুরির সাথে যদি ভালো খাওয়া না জোটে, তবে বাঙালির বেড়ানো জমে না। টাকিতে এলে দুটি জিনিস চেখে দেখা চাই:

  1. নদীর তাজা মাছের থালি: দুপুরের খাঁটি ইলিশ বা পাবদার থালি ছাড়া এই ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ যেন একেবারে অপূর্ণ থেকে যায়। দুপুরের আহারে স্থানীয় ভাতের হোটেলে পাবেন নদী থেকে সদ্য ধরা পাবদা, পারশে, টাটকা ইলিশ কিংবা গলদা চিংড়ি। গরম ভাতের সাথে হালকা ঝোল দারুণ জমে।
  2. টাকির বিখ্যাত ছানাপোড়া: টাকির মিষ্টির দোকানে খোঁজ করুন ‘ছানাপোড়া’। মাটির সরায় ছানা আর চিনির রস দিয়ে কাঠের ধিমে আঁচে পোড়ানো হয় এই মিষ্টি। নরম, রসালো আর হালকা ধোঁয়াটে সুবাস মুখে লেগে থাকে। শীতের দিনে এলে নলেন গুড়ের সন্দেশও সাথে নিতে পারেন।

এক দিনের সহজ ভ্রমণ সূচি

  • সকাল ০৭:০০: শিয়ালদহ থেকে হাসনাবাদ লোকাল ধরা বা গাড়িতে রওনা দেওয়া।
  • সকাল ০৯:৩০: টাকি পৌঁছানো। ঘাটের কাছে গরম কচুরি ও জিলিপি দিয়ে সকালের খাওয়া সারা।
  • সকাল ১০:১৫: সোজা চলে যান গোলপাতার বনে। সকালের রোদে বাঁশের সাঁকো বেয়ে বনের ভেতর হাঁটা।
  • দুপুর ১২:১৫: রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ি, নাটমন্দির আর জোড়া শিবের দেউল ঘুরে দেখা।
  • দুপুর ০১:৩০: নদীর ধারের ভাতের হোটেলে টাটকা মাছ দিয়ে দুপুরের খাওয়া।
  • বিকেল ০৩:৩০: ইছামতী নদীর ঘাটে সময় কাটানো। দশমীর দিনে এই সময়েই নাও নামতে শুরু করে নদীর জলে। অন্য দিনে সাধারণ নৌকো ভাড়া করে নদী ভ্রমণ করা যায়। নদীর বুকে পড়ন্ত রোদে সূর্যাস্ত দেখতে ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ-এ একটি নৌকো ভাড়া করে নেওয়া সেরা সিদ্ধান্ত।
  • বিকেল ০৫:৩০: মিষ্টির দোকান থেকে গরম ছানাপোড়া খাওয়া ও বাড়ির জন্য কেনা।
  • সন্ধ্যা ০৬:১৫: টাকি স্টেশন থেকে কলকাতার ট্রেনে ওঠা বা গাড়িতে ফেরা।
টাকিতে ইছামতী নদীর তীরে বাঁধা রঙিন পর্যটকবাহী মোটর বোট Traditional colorful motorized tour boat anchored along the grassy banks of Ichamati River in Taki
শান্ত দুপুরে ইছামতীর পাড়ে বাঁধা রঙিন নাও: নদীর বুকে ভেসে দুই বাংলার সীমানা দেখার প্রস্তুতি

টাকি ভ্রমণের খরচের হিসেব

পকেটের কথা ভাবলে খুব কম খরচে এমন আনন্দদায়ক ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ হাতের কাছে আর দুটি মেলা ভার।

  • ট্রেন ভাড়া: শিয়ালদহ থেকে টাকি রোড যাওয়া-আসা মিলিয়ে মাথাপিছু ৪০ টাকা।
  • টোটো ভাড়া: সারাদিন ঘোরার জন্য ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা (শেয়ারে গেলে খরচ আরও কম)।
  • নৌকো ভাড়া: সাধারণ দিনে পুরো নৌকো ঘণ্টায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। দশমীর দিনে মাথাপিছু ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হতে পারে।
  • গোলপাতার বন টিকিট: জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা।
  • খাওয়াদাওয়া: মাছ-ভাতের থালি ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা; মিষ্টি ও চা-নাস্তা ১০০ টাকা।

জরুরি কিছু টিপস

  • আসল পরিচয় পত্র সাথে রাখুন: গোলপাতার বনে বিএসএফ জওয়ানরা আধার কার্ড ছাড়া ঢুকতে দেন না। ফোনের ছবির বদলে আসল কার্ড সঙ্গে রাখুন।
  • দশমীর ভিড় সামলানো: দশমীর ভাসান দেখতে চাইলে দুপুরের মধ্যেই ঘাটে জায়গা নেওয়া ভালো। বেলার দিকে পা ফেলার জায়গা থাকে না।
  • নৌকোয় চড়ার নিয়ম: নদীর বুকে নামলে লাইফ জ্যাকেট গায়ে রাখা জরুরি। অতিরিক্ত যাত্রী তোলা নৌকো এড়িয়ে চলুন।
  • ছবি তোলার সতর্কতা: সীমান্ত এলাকা হওয়ায় ড্রোন ওড়ানো বা সেনাচৌকির ছবি তোলা কড়াভাবে বারণ।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর

১. এক দিনে কি টাকি ঘুরে আসা সম্ভব?

হ্যাঁ, কলকাতা থেকে মাত্র আড়াই ঘণ্টার পথ। সকালে বেরিয়ে সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যার মুখে অনায়াসে বাড়ি ফেরা যায়।

২. বিজয়া দশমীর দিনে কি সাধারণ মানুষ নৌকোয় উঠতে পারেন?

হ্যাঁ, তবে স্থানীয় নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট ঘাট থেকে লাইফ জ্যাকেট পরে তবেই নামা যায়। সুরক্ষার খাতিরে নজরদারি খুব কড়া থাকে।

৩. টাকিতে থাকার জন্য ভালো হোটেল আছে কি?

টাকিতে রাত কাটানোর জন্য রাজ্য সরকারের নিজস্ব ট্যুরিস্ট লজ রয়েছে। অগ্রিম বুকিং ও সঠিক ভাড়ার তথ্যের জন্য দেখে নিতে পারেন পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অফিসিয়াল পোর্টাল।

৪. এই ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ কি ছোট বাচ্চা বা বয়স্কদের নিয়ে করা নিরাপদ?

হ্যাঁ, রাস্তাঘাট সমতল এবং টোটো যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকায় এই ট্রিপ সকলের জন্যই আরামদায়ক।

নদীর হাওয়া, ঐতিহাসিক রাজবাড়ি আর মিষ্টির স্বাদ মেখে এই ইছামতীর ভাসান ও টাকি ডে ট্রিপ আপনার স্মৃতির পাতায় বহুদিন থেকে যাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top